পৃষ্ঠাসমূহ

বৃহস্পতিবার, ২৪ মে, ২০১২

বাংলাদেশের কী হবে?


আতঙ্কের সমাজ, দখলদার অর্থনীতি, জমিদারি রাজনীতি এটাই বর্তমান সময়ের প্রধান পরিচয়। এর মধ্যেই আমরা ‘আছি’। বর্তমানে সারা দেশে দুর্নীতি দখলদারি, নানা অগণতান্ত্রিক আইনি-বেআইনি তৎপরতা, সন্ত্রাস-টেন্ডারবাজি, নিয়োগ-বাণিজ্য ইত্যাদি বিস্তারের সুবিধাভোগী খুবই নগণ্য। যদি সামনে বিএনপি-জামায়াত বিশেষত যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের বিষয় না থাকত তাহলে যারা আওয়ামী লীগকে ভোট দিয়েছে তাদের ক্ষোভেই সরকার টালমাটাল হতো। আওয়ামী লীগ সরকারের জন্য এটাই আত্মরক্ষার প্রধান অবলম্বন। ক্ষুব্ধ সমর্থকদের ধরে রাখায় বিএনপি-জামায়াতের ভয়, যুদ্ধাপরাধীদের অস্তিত্ব তাদের প্রধান ভরসা। বিএনপি-জামায়াতও এই অস্ত্রই বরাবর কাজে লাগিয়েছে। আওয়ামী আমলের ভীতি প্রচার, কৃত্রিম ভারত-বিরোধিতা, ইসলাম ধর্ম বিপন্নতার প্রচারণা তাদের অনেক অপকর্ম জায়েজ করার প্রধান অবলম্বন। যারা এখন আওয়ামী লীগ বা বিএনপির পেছনে আছে তাদের অধিকাংশ অপছন্দ নিয়েই আছে, আছে অন্য দলের ভয়ে। অতএব জমিদারি রাজনীতির দুই ধারা পরস্পর পরস্পরের ভরসা, পরস্পর পরস্পরের জন্য অপরিহার্য। ঐক্য ও ধারাবাহিকতারও তাই কমতি নেই। 
যে কেউ সরকারের বা কোনো প্রতিষ্ঠানের কর্তাব্যক্তিদের অন্যায় নিপীড়ন বা দুর্নীতির বিরুদ্ধে দাঁড়ালে সরকারি দল বা কর্তাব্যক্তিদের একটা মোক্ষম ঢাল হলো এটা বলা যে, এটা যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের বিরুদ্ধে চক্রান্ত। শিক্ষক, তৈরি পোশাক শ্রমিক, জমি সম্পদ রক্ষার আন্দোলন, শিক্ষার্থীদের শিক্ষা আন্দোলন—সবাইকে এই গালি শুনতে হয়। কিন্তু রামদা হাতে সরকারি পান্ডা, নিয়োগ-বাণিজ্যে নিয়োজিত এমপি, গুম খুনে সক্রিয় নানা বাহিনী, সরকারি হামলা নির্যাতন দখল, আর অদক্ষ বিচারপ্রক্রিয়া থাকতে কি আর কারও চক্রান্ত করার দরকার হবে? ৪০ বছর ধরে একাত্তরের দুর্বৃত্তদের বিচার আটকে আছে। জনগণের একটি বড় অংশ তারেক জিয়ার জমিদারি তাণ্ডব থেকে বাঁচার জন্য এবং যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের আশায় আওয়ামী লীগকে ভোট দিয়েছিল। সরকারের ভূমিকা থেকে মনে হয় এই সরকার তারেক জিয়াকে মহানায়ক না বানিয়ে, যুদ্ধাপরাধীদের হাতে আত্মরক্ষার আরও পুঁজি সরবরাহ না করে ভুল নীতি, দুর্নীতি, সন্ত্রাস, দখলদারির যথেচ্ছাচার থেকে সরবে না। 
দম দেওয়া পুতুলের মতো স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কথা বলেন। পরিস্থিতি, কাল বা প্রশ্ন কোনো কিছুই তাঁর গৎবাধা কথা বদলাতে পারে না। একের পর এক খুনি ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকে, খুনি ক্ষমা পায়, তিনি সব সময় বলতে থাকেন ‘অপরাধী যেই হোক তাকে অবশ্যই ধরা হবে।’ গুম খুন হাজার ছাড়িয়ে যায়; তিনি বলেন, ‘দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সবচেয়ে ভালো।’ ক্রসফায়ারে মৃত্যু হতে থাকে। রামদা হাতে সরকারি সংগঠনের কর্মীরা নানা জায়গায় সন্ত্রাস তৈরি করে, দখল চলে। আইনমন্ত্রী গড়গড় করে বলতেই থাকেন, ‘আইন সবার জন্য সমান।’ চাঁদাবাজি শুধু উর্দিছাড়া নয়, উর্দিপরা লোকজনও করতে থাকে। আইন-আদালত কী করে, তা নিয়ে তো কথা বলাই নিষেধ। প্রধানমন্ত্রী প্রায় সব সমস্যা সমাধানে নিজেই দায়িত্ব নেন। কিন্তু কোনো সমাধান দেখা যায় না। দিনবদলের কথা অর্থহীন। 
যাদের ২৪ ঘণ্টা রাষ্ট্রীয় অর্থে প্রতিপালিত নানা বাহিনীর পাহারায় কাটে তারা ছাড়া বাকি কারও তাই আতঙ্ক কাটে না। নিজের ও স্বজনের জীবন নিয়ে, পথের নিরাপত্তা নিয়ে, জিনিসপত্রের দাম, জীবিকা, ভবিষ্যৎ নিয়ে উৎকণ্ঠা দিনরাত। সবচেয়ে বড় ভয়, দিনের পর দিন সবকিছুতে অনিশ্চয়তা। বাংলাদেশের মানুষের অবস্থা এখন এমনই যে মানুষের জন্য মানুষের শোক, আতঙ্ক কিংবা উদ্বেগ নিয়েও একটু স্থির হয়ে বসা যায় না। নতুন আরেক আঘাত পুরোনো শোক বা আতঙ্ককে ছাড়িয়ে যায়। টিভি বা সংবাদপত্রেরও ঠাঁই নেই সবগুলোকে জায়গা দেওয়ার, কিংবা লেগে থাকার। 
বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রধান দুই দলের সংঘাত কখনোই জমিদারি লড়াইয়ের চরিত্র থেকে বের হতে পারেনি। যে অংশ ক্ষমতায় থাকে তাদের ইচ্ছা হয় চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত নেওয়ার। তাই একপর্যায়ে বিরোধ চরমে ওঠে। তখন মাঝেমধ্যে সম্রাটের দূতের মতো যুক্তরাষ্ট্র বা ইউরোপ এমনকি ভারতের প্রতিনিধিদের সাড়ম্বর আগমন ঘটে। সংঘাতে তাদের কর্তৃত্ব বাড়ে। দুই পক্ষ প্রতিযোগিতা করে ‘প্রভুর’ জন্য আরও বাড়তি সুবিধা দেওয়ার অঙ্গীকার করে নিজেদের ক্ষমতা পাকাপোক্ত করতে চেষ্টা করে। আফ্রিকার দেশগুলোর মতো এ দেশে গোত্র বা এথনিক সংঘাতের অবস্থা নেই। কিন্তু আওয়ামী লীগ-বিএনপি লড়াই যেন তার স্থানই পূরণ করতে যাচ্ছে, রাজনৈতিক সংঘাত নিতে যাচ্ছে ট্রাইবাল সংঘাতের রূপ। সারা দেশ, সব প্রতিষ্ঠান এই দুই ভাগে ভাগ হয়ে আছে। যারা লাভবান হচ্ছে তারা তালিও দিয়ে যাচ্ছে। প্রকাশ্যে বা গোপনে।
দুই দলের ব্যানার দেখে পুরো চিত্র পাওয়া যাবে না। দেখতে হবে ব্যানারের পেছনে দাঁড়ানো দখলদার কমিশনভোগীদের। দলের ব্যানার আসলে ব্যবহূত হয় তাদের মুখ ঢাকার জন্য। মানুষ দল দিয়ে বিচার করে, দলের ওপর ভরসা করে, দলের ওপর বিরক্ত হয়, ক্ষুব্ধ হয়, ক্ষোভে-দুঃখে চিৎকার করে। দল আসে যায়। কিন্তু কমিশনভোগী, দখলদারদের পরিবর্তন হয় না। তাদের শক্তি ও অবস্থান আরও জোরদার হয়। দুই দলের তীব্র সংঘাত চোখে পড়ে, আড়ালে দখল লুণ্ঠন কমিশনসহ নানা তৎপরতায় অংশীদারি ঠিকই চলে বহাল তবিয়তে। ব্যাংক, শেয়ারবাজার, মুদ্রা পাচার, মিডিয়াসহ নানা জায়গায় তার স্বাক্ষর আছে। 
সে জন্য গুম, খুন, ক্রসফায়ার, উর্দিপরা বা উর্দিছাড়া লোকজনদের ডাকাতি চাঁদাবাজি, কৃত্রিম কিংবা উসকে তোলা রাজনৈতিক উত্তেজনা, হরতাল, বিদ্যুতের সংকট—সবকিছু নিয়ে মানুষের অস্থিরতা, উদ্বেগ, অসুস্থতার মধ্যে ঠিকই অনেক কিছু হয়ে যেতে থাকে। শতকরা এক ভাগের হাতে আরও সম্পদ কেন্দ্রীভূত হতে কোনো বাধা নেই। পাহাড় নদী বন দখলকাজে কোনো সমস্যা নেই। দেশের সমুদ্র, সম্পদ, অর্থনীতিতে দেশি-বিদেশি লুটেরাদের আধিপত্য বৃদ্ধির আয়োজনে কোনো প্রতিবন্ধকতা নেই। এগুলোতে দুপক্ষের বিরোধ নেই। 
এখানে দুই বন্ধু (বা শত্রুর) গল্প বলি। এরা হতে পারে দুজন আমলা, দুজন ঠিকাদার, দুজন কনসালট্যান্ট, দুজন মন্ত্রী এমনকি হতে পারে দুই সময়ের দুই সরকার। গল্পের শুরুর কালে বন্ধু ‘ক’ ও ‘খ’-এর সীমিত আয়, স্বাভাবিক জীবনযাপন। এর মধ্যে একদিন ‘ক’ ‘খ’-এর বাড়িতে গিয়ে হতবাক। ঘরবাড়িতে নতুন বিত্তের চিহ্ন। ‘কোথায় পেলে তুমি এসব?’ বারবার প্রশ্ন করায় একপর্যায়ে ‘খ’ ‘ক’ কে জানালা দিয়ে বাইরে তাকাতে বলে। বাইরে একটা সড়ক ছাড়া আর কিছু নেই। ‘খ’ বলে ‘এটাই’। দিন মাস বছর যায়। ‘খ’ যায় ‘ক’-এর বাড়িতে। ‘ক’-এর বাড়ির জাকজমক তার চেয়েও বেশি। ‘কীভাবে এত টাকা বানানো সম্ভব?’ ‘ক’ এবার হাসিমুখে ‘খ’-কে জানালা দিয়ে তাকাতে বলে। একটা সেতু, দুপাশে ভাঙা, আধাখেচড়া পড়ে আছে। ‘খ’ বুঝতে পারে। আবার দিন মাস বছর যায়। ‘ক’ যায় ‘খ’-এর বাড়িতে, এখন সেটা অট্টালিকা। বিত্তের আওয়াজ বেড়েছে অনেক গুণ। ‘ক’-এর মাথায় প্রশ্ন। ‘এত টাকা কীভাবে সম্ভব?’ ‘খ’ আবার জানালা দিয়ে তাকাতে বলে। বাইরে কোনো কিছু নেই। শুধু মাঠ। ‘ক’ প্রথমে বুঝতে পারে না। ‘খ’ বলে, ‘এই তো’। প্রথমে কাজ করে লাভ, পরে কিছু কাজ করে পুরো টাকা। পরে কিছুই না করে পুরোটাই মেরে দেওয়া।
সেটাই তো হওয়ার কথা। প্রক্রিয়া যদি একই থাকে ক্ষুধা দিন দিন বাড়তে থাকে। পেট তো ভরতে হবে। তাই এভাবে চলতে চলতে মাঠ, গাছ, বন, জঙ্গল, পাহাড়, নদী, নালা, খালবিল সব হজম হতে থাকে। ‘ক’ আর ‘খ’-এর যখন যার সুযোগ আসে। কখনো প্রতিযোগিতা কখনো সহযোগিতা। কখনো ঐক্য কখনো সংঘাত। দখল, কমিশনের ওপর দাঁড়ানো বিত্ত-বৈভব শানশওকতে শহরের কিছু কিছু স্থান ঝলমল করতে থাকে। অনেকে স্মরণ করতে পারেন সেলিম আল দীনের মুনতাসির ফ্যান্টাসি নাটক। সবকিছুই প্রধান চরিত্র মুনতাসিরের খাদ্য। তার ক্ষুধার কোনো শেষ নেই। আমাদের দেশে একের পর এক শাসকগোষ্ঠী একজনের থেকে অন্যজন আরও বেশি মুনতাসির। ক্ষমতাবানেরা যখন এভাবে নিজের অর্থনীতি তৈরি করেন তখন রাজনীতি কেন জমিদারি থেকে আলাদা হবে? আমাদেরই বা সদা আতঙ্ক ছাড়া আর কী পাওয়ার আছে?
দেশি-বিদেশি দখলদারদের জন্য দুই দলের পালাবদল খুবই সুবিধাজনক। এই নিয়েই বেঁচে থাকতে হবে, সমাজে এই চিন্তা টিকিয়ে রাখতে কারও কারও সক্রিয়তা আছে। এই অবস্থায় তাহলে কী হবে বাংলাদেশের? পরিবারতন্ত্রের আড়ালে, চোরাই টাকার মালিক সন্ত্রাসী প্রতারক দখলদার কমিশনভোগীদের হাতে, নিজেদের সর্বনাশ দেখতেই থাকবে শতকরা ৯৯ ভাগ মানুষ? তাহলে কি আর উপায় নেই? শক্তিশালী মিডিয়া ও সুশীল সমাজের দরবারে এই বলয়ের বাইরে আলোচনারও সুযোগ কম। ভিন্ন স্বর ভিন্ন সত্য ভিন্ন সম্ভাবনা নিয়ে মানুষের চিন্তার সুযোগও তাই তৈরি হয় না। ফলে জনগণের মধ্যে এক অসহায়ত্বের বোধ এখন প্রায় স্থায়ীরূপ নিয়েছে। 
কিন্তু এই দুই ধারার একটির বদলে অন্যটি আমাদের বর্তমান অবস্থার যে কোনো সমাধানই দেবে না তা বোঝার জন্য আর কত পালাবদল দরকার? আর কত ক্ষয় আর কত সর্বনাশ দেখতে হবে আমাদের? এই জমিদারি সংঘাত ও ঐক্য কোথায় নিয়ে যাবে দেশকে, ক্ষমতা তাদেরও হাতে থাকবে কি না, দেশি-বিদেশি কারা অপেক্ষমাণ—সবকিছুই এক ভয়ংকর অনিশ্চয়তা। এই বিষচক্র থেকে বাঁচার জন্য প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সামরিক শাসন যে সমাধান নয় তার প্রমাণ বারবার হয়েছে। বরং এতে এই প্রক্রিয়ারই আরও শ্রীবৃদ্ধি হয়েছে। আর দুজনের সংলাপ ও ঐক্য? তাতে এই ধারাবাহিকতা ও জনগণের অবস্থার পরিবর্তনের তো কিছু নেই।
সে কারণেই যুদ্ধাপরাধী ও লুটেরা শক্তির, দখলদার ও জমিদারদের রাজনৈতিক মতাদর্শিক প্রভাব অতিক্রম করে জনগণের রাজনৈতিক শক্তির বিকাশ ছাড়া উপায় দেখি না। নিষ্ক্রিয়, আচ্ছন্ন আর সন্ত্রস্ত জনগণের মধ্যে ক্ষমতার বোধ বিকশিত হওয়া ছাড়া এটা সম্ভব নয়। দখলদারদের দাপটে বাংলাদেশ নিয়ে স্বপ্ন দেখাই এখন অসম্ভব মনে হতে পারে। কিন্তু বর্তমান ক্ষমতার জালের আচ্ছন্নতা থেকে মুক্ত হলে, নিজেদের নিয়ে স্বপ্ন দেখতে সক্ষম হলে, জনগণ তার অন্তর্গত বিশাল শক্তিও অনুভব করতে সক্ষম হবে, সক্ষম হবে স্বাধীন পথ গ্রহণ করতে। মানুষ যদি নিজে মুক্ত না হয়, তার মুক্তির কোনো সম্ভাবনা তৈরি হয় না। 
আনু মুহাম্মদ: অর্থনীতিবিদ ও অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।

বৃহস্পতিবার, ৩ মে, ২০১২

সমুদ্রসীমা রায়: স্বস্তি ও উদ্বেগ


anu-f1111সমুদ্র সাধারণভাবে বিশ্বের সকল মানুষের সম্পদ। কিন্তু এই বিশ্বের সকল মানুষের এই সাধারণ সম্পদ সাম্রাজ্যবাদী কিছু রাষ্ট্র আর বহুজাতিক সংস্থার মুনাফা আর দখল তৎপরতায় ক্ষতবিক্ষত, দূষিত, বিপর্যস্ত। যে সমুদ্র অপরিমেয় সম্পদের ক্ষেত্র তা বর্তমান আগ্রাসী দখলদার বিশ্বব্যবস্থায় যুদ্ধ, ভয়ংকর গবেষণা এবং মুনাফামুখি নানা তৎপরতায় মানুষের কর্তৃত্বের বাইরে। সবল কতিপয় রাষ্ট্র ও সবল ক্ষুদ্র মুনাফাভোগী শ্রেণীর আধিপত্য এই পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে। এই আগ্রাসী পরিস্থিতির মধ্যে দুর্বল দেশগুলোর জনগণকে সতর্ক থাকতে হয়, অবস্থান নিশ্চিত রাখবার জন্য আন্তর্জাতিক বিভিন্ন আইনের আশ্রয় নেবার জন্য দক্ষ প্রস্তুতি রাখতে হয়। আর এসব দেশের সরকার যদি জনগণের স্বার্থ প্রতিনিধিত্ব না করে তাহলে জনগণের দিক থেকে সতর্কতা বাড়াতে হয় আরও বহুগুণ।
১৯৮২ সালের জাতিসংঘ সমুদ্র কনভেনশন আইন অনুযায়ী, যেকোন দেশ সমুদ্রের ভেতর ২০০ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত নিজ সীমা হিসেবে দাবী করতে পারে। এর মধ্যে ১২ মাইল সার্বভৌম সীমার অন্তর্ভূক্ত এবং পরবর্তী ১৮৮ মাইল অর্থনৈতিক অঞ্চল হিসেবে স্বীকৃত। সম্প্রসারিত হিসেবে সমুদ্র ভূমিতে একটি দেশ ৩৫০ মাইল পর্যন্ত নিজেদের কর্তৃত্বাধীন বিবেচনা করতে পারে।
কিন্তু ২০০৮ সালে এসে আমরা জানতে পারি যে, সমুদ্রসীমা নিয়ে ভারত ও মায়ানমার তাদের দাবি জাতিসংঘে উপস্থিত করেছে এবং তাতে বঙ্গোপসাগরে প্রাপ্য সমুদ্রসীমার দুইতৃতীয়াংশ বাংলাদেশের হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশের স্থলভাগের প্রায় দুইগুণ সমপরিমাণ সামুদ্রিক অঞ্চল চলে যাচ্ছে মায়ানমার ও ভারতের হাতে।
২০০১ সালে জাতিসংঘ কনভেনশনে অনুস্বাক্ষর করে বাংলাদেশ। এর ১০ বছরের মধ্যে অর্থাৎ ২০১১ সালের মধ্যে সমুদ্রসীমায় আমাদের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত দাবি প্রতিষ্ঠার জন্য সব প্রমাণাদি ও কাগজপত্র জমা দেবার কথা। ২০০৪ সালে পেট্রোবাংলা, জিএসবি, নেভি, স্পারসো, আইডব্লিউটিএ, সার্ভেয়ার অব বাংলাদেশ থেকে প্রতিনিধি নিয়ে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছিল বলে আমরা জেনেছি, কিন্তু সেটি কোন কাজ করেনি। এরকম অবস্থাতেই তত্ত্বাবধায়ক সরকার ২০০৮ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি সমুদ্র অঞ্চলকে ২৮টি ব্লকে (৮টি অগভীর ও ২০টি গভীর সমুদ্রে) ভাগ করে তৃতীয় দফা বিডিংএর সিদ্ধান্ত নেয় এবং তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য ১৫ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক দরপত্র আহবান করে। বহুজাতিক কোম্পানির সাথে উৎপাদন অংশীদারী চুক্তি (প্রডাকশন শেয়ারিং কন্ট্রাক্ট বা পিএসসি) করবার ব্যাপারে সরকারের বিপুল আগ্রহ দেখা গেলেও সমুদ্রসীমা নিয়ে এই বিপদ সম্পকে এই সরকারের কোনো সক্রিয়তা দেখা যায়নি।
পরিস্থিতি তখন এমন যে, মায়ানমার ও ভারতের দাবি আন্তর্জাতিক ফোরামে স্বীকৃত হলে বাংলাদেশ শুধু বিশাল অঞ্চল হারাবে তাই নয়, জানা অজানা সম্পদের এমন ভান্ডার তার হাতছাড়া হবে যা বহুকালের বহু প্রজন্মের জন্য বাংলাদেশকে পাল্টে দিতে সক্ষম। তাছাড়া সার্বভৌমত্বের ওপর হুমকি তো আছেই। বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগের আরও কারণ ছিল এটাই যে, ভারত ও মায়ানমার তাদের নথিপত্র জমা দিলেও বাংলাদেশের সেসময় পর্যন্ত কোনো প্রস্তুতিও ছিল না। শেষ সময়সীমা ২০১১ সাল, কিন্তু সমুদ্রসীমা নিয়ে দাবি উত্থাপন করতে গেলে সমুদ্রে জরীপসহ অনেক কাজ বাকি, কিছুই হয়নি তখনো।
তখন থেকেই আমরা ‘তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটি’র পক্ষ থেকে সমুদ্রসীমা ও সমুদ্রসম্পদ বিষয়ে কথা বলা শুরু করি। একইবছর বিশেষজ্ঞ ও উদ্বিগ্ন ব্যক্তিদের নিয়ে ‘সমুদ্র অঞ্চল ও সীমানা রক্ষা জাতীয় কমিটি’গঠিত হয়।গবেষক নূর মোহাম্মদ আহবায়ক ও রিয়ার এডমিরাল (অব:) খুর্শেদ আলম এর সদস্য সচিব ছিলেন। এই কমিটি বিভিন্ন সেমিনার প্রকাশনার মধ্য দিয়ে দেশের জনগণের মধ্যে সমুদ্রসীমা ও সমুদ্রসম্পদ বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধিতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করে। খুর্শেদ আলম এই বিষয়ে দীর্ঘদিন কাজ করছেন।বস্তুত তিনিসহ আরও সীমিত কয়েকজন ব্যক্তির গবেষণা লেখালেখি বিশ্লেষণ থেকেই আমরা এই বিষয়ে স্বচ্ছ ধারণা পাই এবং তা জনগণের মধ্যে নিয়ে যেতে চেষ্টা করি। ২০০৯ সালে নতুন সরকার ক্ষমতায় আসবার পর খুর্শেদ আলমকে অতিরিক্ত সচিব পদে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিয়ে সমুদ্র ডেস্কের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব প্রদান করা হয়।এটা ছিল সরকারের একটি সঠিক সিদ্ধান্ত।সুযোগ পেলে বাংলাদেশের মানুষ যে কাজ করতে পারেন তা এখানে প্রমাণিত হয়েছে।
২০০৮ সালে ক্ষমতার নানা কেন্দ্র থেকে বলা হয়েছিল যে, বাংলাদেশের পক্ষে সমুদ্র জরিপ করা সম্ভব নয়। এর জন্য বিদেশি বিশেষজ্ঞ লাগবে, বিশ্বব্যাংকের ঋণ লাগবে, বিপুল অর্থ দরকার, বিদেশি কোম্পানিকে দায়িত্ব দিতে হবে ইত্যাদি ইত্যাদি। অথচ খুর্শেদ আলমের নেতৃত্বে মাত্র ৩৫ কোটি টাকা ব্যয়ে এই প্রয়োজনীয় জরীপ কাজ সম্পন্ন করা সম্ভব হয়, যা মায়ানমারের সাথে মোকাবিলায় খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
আন্তর্জাতিক আদালতে মায়ানমারকে মোকাবিলা করতে গিয়ে সমুদ্রসীমা নিয়ে বাংলাদেশ যে দ্রুত প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে তার স্থায়ী গুরুত্ব আছে। নিজস্ব প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি ছাড়াও সামনে ভারতের সঙ্গে বিরোধ নিষ্পত্তিতেও এগুলো কাজে লাগবে। ভারতের সাথে এখনও আমাদের সমস্যার নিষ্পত্তি হয়নি। ভারতের সাথে দ্বিপক্ষীয় আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা মিটিয়ে ফেলার কথা বলছেন কেউ কেউ। সেটা খুবই বিপজ্জনক প্রস্তাব। কারণ, ভারতের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় আলোচনার অভিজ্ঞতা আমাদের মোটেই ভালো নয়। ভারত সবসময়ই আন্তর্জাতিক বিষয় দ্বিপক্ষীয়ভাবে সারতে চায়। কিন্তু তাতে কোনোক্ষেত্রেই বাংলাদেশের লাভ হয়নি, বরং ক্ষতি হয়েছে। আন্তর্জাতিক ফোরাম ও আইনি ব্যবস্থা ছাড়া অন্য কোনোভাবে ভারতের সঙ্গে সমাধান হবে না। মামলার রায়ের মধ্য দিয়েই উভয় পক্ষ নিজ অঞ্চল ও সীমানা নির্ধারন করতে পারবে। তবে এর জন্য আরও সতর্ক ও দক্ষ প্রস্তুতি লাগবে। বাংলাদেশের সরকার তার ভূমিকা পালনে আন্তরিক হলে, শৈথিল্য না দেখালে বা ভারতের প্রতি বিশেষ ছাড় দেবার কোন প্রবণতা না থাকলে ভারতের সাথে আমাদের বিজয় অর্জন খুবই সম্ভব।
ভারতসহ আরও বেশকিছু বিষয় এখনও মীমাংসা বাকি থাকলেও ১৪ মার্চের রায়ের মাধ্যমে সমুদ্রের একটি নির্দিষ্ট সীমার ওপর আমাদের আইনি অধিকার স্বীকৃত হয়েছে। এটা আমাদের জাতীয় সার্বভৌমত্বের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এই আইনী অধিকার কার্যকর অধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠা হবে কিনা সেটা নিয়েই এখন সংশয় তৈরি হয়েছে।
সমুদ্রসীমা নিয়ে এই রায়ের পরপরই সরকার ও সরকার বহির্ভূত কোম্পানিমুখি বিভিন্ন লোকজন যেভাবে বিদেশি কোম্পানিকে ব্লক ইজারা দেয়ার ব্যাপারে আগ্রহ ও উচ্ছাস দেখাচ্ছেন তাতে মনে হচ্ছে এই বিজয় বহুজাতিক কোম্পানির, বাংলাদেশের জনগণের নয়। কিন্তু সমুদ্রসীমায় বাংলাদেশের মালিকানা মানে এখানকার জাতীয় সম্পদের ওপর জনগণের শতভাগ মালিকানা। সম্পদের শতভাগ নিজেদের কাজে ব্যবহারের বিষয়টি নিশ্চিত না হলে এই বিজয় অর্থহীন।
সমুদ্রসীমা নিয়ে মায়ানমারের সাথে নিষ্পত্তি হবার পর কনোকোফিলিপসকে সমুদ্রের আরও ছয়টি ব্লক দেবার ব্যাপারে তোড়জোড় শুরু হয়েছে। গত বছরের ১৬ জুন সরকার এই মার্কিন কোম্পানির সাথে যে চুক্তি করে, তা বাংলাদেশের জ্বালানী নিরাপত্তা নিশ্চিত করেনি বরং বাংলাদেশকে বিভিন্ন দিক থেকে বড় বিপদের মুখে নিক্ষেপ করেছে। দক্ষতার যুক্তি দিয়ে দুর্ঘটনার রাজা কনোকোফিলিপসকে ১০ ও ১১ ব্লক তুলে দিলেও এই কোম্পানি এখন চীনা একটি কোম্পানিকে সাবকন্ট্রাক্ট দিয়ে বাংলাদেশের সমুদ্রব্লকে কাজ করাচ্ছে। যে রফতানিমুখি চুক্তির ভিত্তিতে এই কোম্পানি আমাদের সমুদ্রের ব্লকগুলো ইজারা নিয়েছে, এরকম শর্তে আরও ব্লক ইজারা নেওয়ার জন্য বিভিন্ন বহুজাতিক কোম্পানি শকুনের দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে আছে। কোম্পানিমুখি প্রচারকেরা এই চুক্তির পক্ষে সাফাই গাইতে গিয়ে সবসময় বাংলাদেশের অক্ষমতার কথাই বলেন, হীনম্মন্যতাই তাদের প্রধান অবলম্বন। অথচ সমুদ্রের জানা অজানা সম্পদের ওপর যাতে জাতীয় মালিকানা ও জনগণের যথাযথ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়, তার জন্য প্রয়োজনীয় জাতীয় সক্ষমতার বিকাশের কোন উদ্যোগ নেবার কথা তাদের মুখে কখনো শোনা যায়না। তাদের কথা অনুযায়ী চললে বাংলাদেশের হীনদশা কখনো কাটবে না।
আরও একটি উদ্বেগের বিষয় হলো, বঙ্গোপসাগরের দিকে যুক্তরাষ্ট্রের বহুদিনের মনোযোগ আরও বেড়েছে । তারা আমাদেরকে সন্ত্রাসীদের হাত থেকে রক্ষা করতে চায়, আমাদের নিরাপত্তা দিতে চায়! কিন্তু আমরা জানি, সাম্রাজ্যবাদী শক্তি হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র পৃথিবীর যেখানেই গেছে, সেখানে হত্যা, লুটপাট, অশান্তি, নিরাপত্তাহীনতা ও ধ্বংস ছাড়া আর কিছু আসেনি। যুক্তরাষ্ট্র যদি বলে নিরাপত্তা তাহলে আসে সহিংসতা, যদি বলে শান্তি আসে ধ্বংস, যদি বলে গণতন্ত্র আসে স্বৈরতন্ত্র।বঙ্গোপসাগরে নিরাপত্তার নামে তাদের কর্তৃত্ব বিস্তারের চেষ্টা কিংবা এই কর্তৃত্ব নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র চীন ভারত ঐক্য কিংবা সংঘাত সবগুলোই বাংলাদেশের নিরাপত্তার জন্য হুমকি।আমরা জানি যে, বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় ‘অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক দুভাবেই দক্ষিণ এশিয়া এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল হয়ে উঠেছে। ২০০৮ সালে দায়িত্ব গ্রহণের পর ইরাক থেকে সরে দক্ষিণ এশিয়ায় মনোযোগ কেন্দ্রীভূত করেছেন প্রেসিডেন্ট ওবামা। এই অঞ্চলে ভারত, চীন, পাকিস্তানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের নানা মাত্রায় ঐক্য ও সমঝোতার প্রধান বিষয় হল, জ্বালানী খনিজ সম্পদ, ও অন্যান্য প্রাকৃতিক সম্পদ আর সেইসঙ্গে এগুলোর আমদানি রফতানির জন্য তেল ও গ্যাস পাইপলাইন, বন্দরের উপর নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করা’। (The Militarization of India, http://www.counterpunch.org/2011/05/27/the-militarization-of-india/)
সমুদ্র সীমায় যদি বিদেশি সৈন্য মোতায়েন হয় কিংবা যদি সমুদ্রের বিশাল সম্পদের মালিকানা বহুজাতিক কোম্পানির হাতে তুলে দেয়া হয়, যদি এই সম্পদ রফতানিমুখি চুক্তির আড়ালে বিদেশে পাচার হয় তাহলে অর্জিত এই সার্বভৌম অধিকার প্রহসন ছাড়া আর কী হবে? কারণ, বাংলাদেশে তো বটেই বহুদেশে এরকম অভিজ্ঞতা আছে যে, সম্পদ পেলেই জনগণ সেই সম্পদের ব্যবহার করতে পারবে তা নয়, সম্পদ পেলেই তার ওপর জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হবে তা নয়। সরকার যদি জনগণের পক্ষে দৃঢ় অবস্থান গ্রহণ না করে তাহলে সম্পদ বরং পরিণত হতে পারে অভিশাপে। আমরা জানি সরকারের দায়িত্ব হচ্ছে জনগণের স্বার্থের প্রতিনিধিত্ব করা কিন্তু এদেশের বিভিন্ন সরকার সাম্রাজ্যবাদের কিংবা কমিশনভোগী দেশি লুটেরাদের স্বার্থরক্ষার্থেই তাদের সর্বশক্তি নিয়োগ করেছে। ভয়টা সেখানেই।
আগে জাতীয় মনোযোগে না থাকলেও এটা এখন সবাই স্বীকার করবেন যে, বাংলাদেশ শুধু নদীমাতৃক দেশ নয়, সমুদ্রমাতৃকও। অতএব সমুদ্রের ওপর কর্তৃত্ব এবং এর সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করবার জন্য এর সাথে অসঙ্গতিপূণ চুক্তি বাতিলের পাশাপাশি জাতীয় সক্ষমতা বিকাশে বিস্তৃত পরিকল্পনা নেয়াই এখন প্রধান করণীয়। এই লক্ষ্যে বিশ্ববিদ্যালয়, বিভাগ, গবেষণা প্রতিষ্ঠান তৈরি করা দরকার। বড় দায়িত্ব নেবার মতো করে পেট্রোবাংলাকে সাজানো দরকার। প্রয়োজনে প্রবাসী বাংলাদেশীদের এই কাজে যুক্ত করা খুবই সম্ভব। সরকার যদি এর উল্টো পথে চলে, তাহলে জনগণকেই তার নিজের সম্পদ বুঝে নিতে ও সার্বভৌম অস্তিত্ব নিশ্চিত করতে সক্রিয় ভূমিকা নিতে হবে।

আনু মুহাম্মদ: শিক্ষক, অর্থনীতিবিদ, গবেষক এবং তেল-গ্যাস রক্ষা জাতীয় কমিটির সদস্যসচিব ।