পৃষ্ঠাসমূহ

বুধবার, ৪ এপ্রিল, ২০১২

বিশ্ব অর্থনীতিঃ বিদ্রোহের নতুন পরিচয়: ‘আমরা ৯৯%’



আনু মুহাম্মদ | তারিখ: ২০-১০-২০১১
‘আমরা ৯৯%’ এই পরিচয় নিয়ে এবং দখল করার ডাক দিয়ে নারী-পুরুষ, শিক্ষার্থী-শিক্ষক, শ্রমিক, লেখক-শিল্পী, বেকার, দরিদ্র, নিম্নবিত্ত-মধ্যবিত্ত এবং সংবেদনশীল নিপীড়ন-বৈষম্য অন্যায়বিরোধী মানুষের বিক্ষোভ ক্রমেই দেশ থেকে দেশে ছড়িয়ে পড়ছে। সমাবেশে উপস্থিতি শত ছাড়িয়ে হাজার, হাজার ছাড়িয়ে লাখ অতিক্রম করছে। ইতিমধ্যে বিশ্বের প্রায় এক হাজার শহরে এই বিক্ষোভ-সমাবেশ সম্প্রসারিত হয়েছে। কোথাও কোথাও পুলিশ বাধা দেওয়ায় তার সঙ্গে সংঘাত তৈরি হয়েছে। রক্তাক্ত হয়েছে নিরস্ত্র বিক্ষুব্ধ মানুষ। কয়েক দিন আগে বিক্ষোভকারীরা একটি ছোট্ট ভিডিওতে প্রকাশ করেছে, ওবামা ও হিলারি যখন সিরিয়া, লিবিয়া বা মিসরকে উপদেশ দিচ্ছেন মত প্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষায় দমন-পীড়ন বন্ধ করতে, যখন তরুণ প্রজন্মকে নতুন ইতিহাস নির্মাণে অভিনন্দন জানাচ্ছেন, তখন তাদেরই পুলিশ যুক্তরাষ্ট্রের শহরে শহরে নিরস্ত্র বিদ্রোহী তরুণদের ওপর বর্বর হামলা পরিচালনা করছে (http://front.moveon.org/the-most-powerful-occupywallstreet-clip-you-will-see-this-month/) | তরুণ বিক্ষোভকারীরা প্রত্যয়ী, তাদের সংখ্যা ও দৃঢ়তা বাড়ছেই। 
কারা এই বিক্ষোভের লক্ষ্য? কারা এর প্রতিপক্ষ? আর কারা এই আন্দোলনের পক্ষে? এই আন্দোলনের গতিমুখ কোন দিকে? কেন এই দুটি স্লোগানের সঙ্গে সবাই নিজের আকাঙ্ক্ষা মেলাতে পারছে? ‘আমরা ৯৯%’ স্লোগানের মধ্য দিয়ে সর্বত্র শতকরা ৯৯ ভাগ মানুষের জীবন ও স্বার্থের ঐক্য-সংহতি প্রকাশ করা হয়েছে। এটি আরও স্পষ্ট হয় যখন বিক্ষোভকারীরা বলে, ‘শতকরা ১ ভাগ আমাদের সম্পদ দখল করে রেখেছে।’ মাইকেল প্যারেন্টি বলছেন, ‘এটি সরাসরি শ্রেণীযুদ্ধের আওয়াজ।’ সেই এক ভাগের খুব গুরুত্বপূর্ণ অংশ একচেটিয়া পুঁজির প্রতিনিধি বৃহৎ বহুজাতিক সংস্থা, ব্যাংক, বিমা এবং নানা অর্থকরী প্রতিষ্ঠানের স্বার্থের সঙ্গে সম্পর্কিত। তাদেরই কেন্দ্র নিউইয়র্কের বাণিজ্যিক এলাকা ওয়াল স্ট্রিট। এক পোস্টারে এর নাম দেওয়া হয়েছে, ওয়ার স্ট্রিট। কেননা, এদের স্বার্থেই যুক্তরাষ্ট্র দেশের পর দেশ দখল ও সন্ত্রাসে তার সর্বশক্তি নিয়োজিত রেখেছে গত ছয় দশক। আরেক পোস্টারে লেখা, ‘অকুপাই ওয়াল স্ট্রিট, নট আফগানিস্তান’। 
এক পোস্টারে বলা আছে ‘ওয়াল স্টিট গ্রিড=হাংরি কিডস’। ১%-এর লোভের জন্যই সারা বিশ্বে অনাহার, দারিদ্র্য, অকালমৃত্যু—যাদের বড় অংশ শিশু। সারা বিশ্বের সর্বজনের সম্পদ উন্নয়নের নামে গ্রাস করেছে কতিপয় গোষ্ঠী কিংবা করপোরেশন। তাদের মুনাফার লোভ মেটাতে গিয়ে অনিশ্চয়তা, সন্ত্রাস, অপমানে জর্জরিত শতকরা ৯৯ ভাগ মানুষ।
যুক্তরাষ্ট্রের মানুষ কেন অনাহারে এবং চিকিৎসার অভাবে বিপর্যস্ত হবে? কেন আশ্রয়হীন থাকবে? এটা অনেকের কাছে অবিশ্বাস্য মনে হওয়ার কথা। কেননা, বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর, নিজ দেশ শুধু নয় সারা বিশ্বের বিশাল সম্পদ কতিপয় মার্কিন গোষ্ঠী আর তাদের শাগরেদদের দখলে। একটি ছোট ঘোষণা ভিডিওতে প্রথম কর্মসূচি ঘোষণা করা হয় ১৪ জুন (http://www.globalresearch.ca/index.php?context=va&aid=26864)। বলা হয় ‘ডেমোক্র্যাটরা ব্যর্থ, রিপাবলিকানরা ব্যর্থ। এখন আমাদের স্বার্থ আমাদেরই দেখতে হবে, তোমার স্বার্থ তোমাকেই দেখতে হবে।’ আরও বলা হচ্ছে, ‘যারা পরিকল্পিতভাবে আমাদের সম্পদ লুট করে নিজেদের সম্পদের পাহাড় গড়েছে তাদের মুখোমুখি দাঁড়াতে হবে। ‘আমরা ৯৯%।’ কর্মসূচির নাম দেওয়া হয়েছে, ‘অপারেশন এম্পায়ার স্টেট’।
যুক্তরাষ্ট্রের কেন এই হাল? দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে পুঁজিবাদী বিশ্বব্যবস্থার কেন্দ্র ইউরোপ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে সরে যায়। তার পর থেকে আধিপত্য বিস্তার এবং তেল কোম্পানি, অস্ত্র কোম্পানিসহ বৃহৎ ব্যবসায়ীদের স্বার্থ রক্ষা করতে গিয়ে বিশ্বজুড়ে যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ, সহিংসতা, সামরিক শাসন, গণহত্যা বিস্তৃত করেছে। নোয়াম চমস্কি, জোসেফ স্টিগলিজ, নাওমি ক্লেইন, উইলিয়াম ব্লুমসহ অনেকেই তথ্য-উপাত্ত দলিল দিয়ে দেখিয়েছেন কীভাবে সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধের নামে যুক্তরাষ্ট্র হয়ে উঠেছে বিশ্বের সবচেয়ে বড় সন্ত্রাসী শক্তি। কোনো দেশ পারমাণবিক গবেষণা করলে যুক্তরাষ্ট্র তার বিরুদ্ধে নানা প্রতিরোধ তৈরি করে কিন্তু নিজের পারমাণবিক স্থাপনা রক্ষণাবেক্ষণের জন্যই তাকে প্রতিবছর খরচ করতে হয় বিশাল অর্থ। 
এক হিসাবে দেখা গেছে, শুধু এই কাজে যুক্তরাষ্ট্রের যে অর্থ ব্যয় হয় তা যদি এক ডলারের নোট দিয়ে দড়ি বানানো হয় তাহলে তার দৈর্ঘ্য এমন হবে যে, সেই দড়ি দিয়ে চাঁদে গিয়ে ফেরত আসা যাবে। যখন যুক্তরাষ্ট্রে কখনো না কখনো অনাহারে থাকেন এমন মানুষের সংখ্যা সাড়ে ৪ কোটি, বেকার শতকরা প্রায় ১৩ ভাগ, যখন শিক্ষা-চিকিৎসার অর্থ পাওয়া যাচ্ছে না, তখন যুদ্ধ, গোয়েন্দাগিরি, চক্রান্ত ইত্যাদি কাজে এই একই রাষ্ট্রের বার্ষিক খরচ এক হাজার বিলিয়ন ডলার বা এক ট্রিলিয়ন ডলার। অনাহারী মানুষের খাদ্য জোগানের খরচ মাত্র ১০ বিলিয়ন ডলার!
কৃত্রিম জৌলুশ, বিশ্বব্যাপী দখল সন্ত্রাস ও একচেটিয়া পুঁজিকে সম্পদ জোগাতে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্র এখন সবচেয়ে ঋণগ্রস্ত দেশ। বার্ষিক জাতীয় আয়ের কাছাকাছি পৌঁছে গেছে তার ঋণ। রাষ্ট্র, পরিবার এবং ব্যক্তি—সবই এখন ঋণে আকণ্ঠ নিমজ্জিত। রাষ্ট্রীয় ঋণের সীমা যখন অতিক্রম করতে যাচ্ছে, তখন গত মাসে, কংগ্রেসে ঋণসীমা বৃদ্ধির অনুমতি নিয়েছে ওবামা সরকার। গৃহঋণ ধস থেকে পরিষ্কার হয়েছে যে পরিবারের পর্যায়ে আয়ের তুলনায় ঋণ এত বেশি যে তা শোধ করার সীমা তারা পার হয়ে গেছে অনেক আগেই। এই জায়গায় এসে ফুলে ফেঁপে ওঠা ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোও ধসে পড়ে। আবার বেইলআউটের নামে জনগণের করের টাকায় ট্রিলিয়ন ডলার বরাদ্দ করা হয় তাদের উদ্ধারের জন্য। যাদের জন্য মানুষ ও অর্থনীতির দৈন্য তাদের শাস্তি না দিয়ে, হাতে আরও টাকা তুলে দেওয়া হয় ‘চুইয়ে পড়া তত্ত্ব’ অনুযায়ী; যে তত্ত্ব বলে ধনীদের হাতে যত টাকা যাবে তত তারা বিনিয়োগ করবে, তত কর্মসংস্থান বাড়বে। বাড়েনি, বেকারত্ব বেড়েছে। কারণ, সম্পদ কেন্দ্রীভূত যাদের হাতে, অধিক মুনাফার জন্য তারা এমন বিনিয়োগে আগ্রহী যাতে উৎপাদনশীল তৎপরতা বরং ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের কাজ আয় এমনকি খাদ্য যখন অনিশ্চিত তখন বড় বড় করপোরেশনের, যাদের জালিয়াতির জন্য অর্থনীতির ধস, কর্মকর্তারা বেইলআউটের টাকায় আয় করেছে কোটি ডলার বোনাস, বেতন।
এই ছবি শুধু যুক্তরাষ্ট্রের নয়, সারা বিশ্বের অধিকাংশ দেশের। যুক্তরাষ্ট্র যাদের সম্পদ দিয়ে একটা কৃত্রিম সচ্ছলতার ঘোর তৈরি করে মার্কিনদের বহুদিন বুঁদ করে রাখতে পেরেছিল, সেই সব প্রান্তস্থ দেশে লড়াই বহুভাবে বহুদিন ধরেই চলছে। সেই লড়াই দমনে বুদ্ধিবৃত্তিক ও সামরিক জোগানদার ছিল যুক্তরাষ্ট্রই। এখন কেন্দ্র প্রত্যক্ষ করছে বিদ্রোহ। এখন শোষণ-নিপীড়নের বিশ্বায়নের মোকাবিলা করতে জোরদার হচ্ছে প্রতিরোধের বিশ্বায়নের ঐতিহাসিক পর্ব। 
আন্দোলনের সক্রিয় অংশীদার আমেরিকান ওয়ার্কার্স কোঅপারেটিভের প্রেসিডেন্ট বন্ধু ডিজার হর্ন ১৮ অক্টোবর ই-মেইলে সর্বশেষ পরিস্থিতি সম্পর্কে আমাকে জানিয়েছেন। তিনি লিখেছেন, ‘১০ বছর আগে যুক্তরাষ্ট্রে কেউ পুঁজিবাদ শব্দটি উচ্চারণ করলেই তাঁকে কমিউনিস্ট গালি খেতে হতো। এখন পুঁজিবাদের ব্যর্থতা নিয়ে আলোচনা হচ্ছে সর্বত্র। যেসব জায়গায় বিক্ষোভকারীরা অবস্থান নিয়েছে, সেখানেই শিক্ষার নতুন পর্ব বিকশিত হচ্ছে। শিকাগোতে হচ্ছে বহু পাঠচক্র, লিখিত হচ্ছে নাটক, গান। দেখা গেল শ পাঁচেক তরুণ বসে কমিউনিস্ট মেনিফেস্টো নিয়ে আলোচনা করছেন। নিউইয়র্কে জুকত্তি পার্কে নিপীড়িতের থিয়েটার, অর্থশাস্ত্র, নতুন অর্থনীতি, দর্শন নিয়ে একের পর এক বৈঠক হচ্ছে। যৌথ জীবন, সামষ্টিক স্বার্থ, ভবিষ্যতের নতুন মানবিক জীবন নিয়ে আলোচনা চর্চা লড়াইকে ভাষা দিচ্ছে, সামনে তাকানোর শক্তি জোগাচ্ছে। এটা ঠিক যে একক কোনো নেতৃত্ব নেই এই আন্দোলনে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের শহরগুলোতে দীর্ঘদিন যেসব ইউনিয়ন বা সংগঠন গড়ে উঠেছে, তারাই মুখ্য ভূমিকা পালন করছে প্রচার ও যোগাযোগে। এত দিন ভিন্ন ভিন্ন ভাবে কাজ হতো এখন তৈরি হচ্ছে একক লক্ষ্য ও ঐক্যসূত্র। আগামী বছরে শিকাগোতে যে জি-৮ সম্মেলন হতে যাচ্ছে, সেটা নিশ্চিতভাবেই এক বড় লড়াইয়ের ক্ষেত্র হবে।’ 
তিনি আরও বলছেন, ‘এই আন্দোলনের সবচেয়ে বড় সাফল্য হলো, যাঁরা আন্দোলনের কর্মী নন, যাঁরা সংগঠক নন, যাঁরা বামপন্থী নন, এটি তাঁদের হূদয়কেও টান দিয়েছে।...আমাদের সংখ্যা বিস্তৃত হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের মানুষ এখন বিশ্বের মানুুষকে জানাচ্ছে যে তারা আর ঘুমিয়ে নেই। আমরা বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের মুক্তির লড়াইয়ের সঙ্গে সংহতি নিয়ে উঠে দাঁড়াচ্ছি।’ 
‘আমরা ৯৯%’ এখন সারা বিশ্বের নতুন লড়াইয়ের স্লোগান হতে চলেছে। দখল বলে যে স্লোগান তা আসলে শতকরা ১ ভাগের হাত থেকে দেশ ও ক্ষমতার কেন্দ্র দখলমুক্ত করা। একটি অভিন্ন প্রতিপক্ষ, অভিন্ন বৈশ্বিক লক্ষ্য। আমাদের জন্য এই লড়াই নতুন নয়, দেশ ও সম্পদের ওপর জনগণের শতভাগ মালিকানা ও কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার লড়াই তো বাংলাদেশের মানুষ করছেই। এই দুই স্লোগান সারা বিশ্বের, আমাদের।
আনু মুহাম্মদ: অর্থনীতিবিদ ও অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।

শনিবার, ১১ ফেব্রুয়ারি, ২০১২

‘গণি মিয়া’ ও ‘মুহিত সাহেবের’ মধ্যে তফাত কী?

‘মুদ্রাস্ফীতির অব্যাহত চাপ রেখে সরকারগুলো খুব গোপনে, অলক্ষ্যে তাদের নাগরিকদের সম্পদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ হজম করে ফেলে। এ পদ্ধতিতে হজম বা বাজেয়াপ্ত করার এ ঘটনা ঘটে নির্বিচারে। এই প্রক্রিয়ায় যখন বহুসংখ্যক মানুষ দুর্দশাগ্রস্ত হয়, তখন কিছুসংখ্যক সম্পদশালী হয়।’ কথাটা কেইনস বলেছিলেন ১৯১৯ সালে প্রকাশিত দ্য ইকোনমিক কনসিকুয়েন্স অব পিস গ্রন্থে। অর্থনীতির নানা ঘাত-প্রতিঘাত তাই নিছক অর্থনীতির বিষয় নয়, এটা সমাজের শক্তি সমাবেশ ও ক্ষমতা কাঠামোর সঙ্গে সম্পর্কিত। অনেকের উৎপাদিত সম্পদ কিছুজনের হাতে স্থানান্তরিত হওয়ার প্রক্রিয়া কিংবা কিছুজনের স্বার্থে বহুজনের জীবন বিপন্ন করা কোনো স্বয়ংক্রিয় ঘটনা নয়, তা নির্দিষ্ট নীতি, পরিকল্পনা ও রাষ্ট্রের নানা কর্মকাণ্ডের ফল।
বাংলাদেশে মুদ্রাস্ফীতির ঊর্ধ্বগতি ও বিনিয়োগের সংকট এখন একই সঙ্গে চলছে। মূলধারার অর্থশাস্ত্র বলে, মুদ্রাস্ফীতি হলে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়ে। অনেক সময় বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়ানোর যুক্তিতে মুদ্রাস্ফীতিকে একটি উপায় হিসেবেও ব্যবহার করা হয়। মুদ্রাস্ফীতির পক্ষে মুদ্রানীতি ও অন্যান্য পদক্ষেপ নেওয়া হয়। কিন্তু শাস্ত্রের অসুখ ও ওষুধ-সম্পর্কিত এই তত্ত্ব সত্তরের দশক থেকেই বিপদাপন্ন, স্ট্যাগফ্লেশন নামের নতুন আপদ হাজির হওয়ার কারণে। মুদ্রাস্ফীতি যখন বিনিয়োগ-মন্দা কাটানোর ওষুধ হিসেবে ব্যবহার করার কথা, তখন যদি মুদ্রাস্ফীতির সঙ্গে সঙ্গে বিনিয়োগ মন্দা পাশাপাশি চলতে থাকে, তখনই এই বিশেষ সংকটের উদ্ভব ঘটে, তারই নাম স্ট্যাগফ্লেশন। বাংলাদেশে আমরা দেখছি একদিকে মুদ্রাস্ফীতি বাড়ছে, অন্যদিকে বিনিয়োগে শ্লথগতি দেখা দিচ্ছে। মুদ্রাস্ফীতি অথচ বিনিয়োগের অর্থ নেই! তারল্যসংকট।
বিপুল বিনিয়োগ হয়েছিল শেয়ারবাজারে। চোরাই টাকা তো ছিলই, দেশের সব প্রান্তের সব আয়ের মানুষ যেন তাদের সহায়সম্বল নিয়ে শেয়ারবাজারে হাজির হয়, তার জন্য সরকারই সব রকম ব্যবস্থা করেছিল। ব্যাংক বা সরকারি সঞ্চয়ের সব ক্ষেত্রে সুদের হার কমানো হয়েছিল, জেলায় জেলায় কেন্দ্র খোলা হয়েছিল, শেয়ারবাজারে বিনিয়োগে নানা সুবিধা দেওয়া হয়েছিল, ব্যাংকগুলোকে বিনিয়োগের অনুমতি দেওয়া হয়েছিল ইত্যাদি। কাজ নেই, দ্রুত আয়ের তাগিদ আর এসব সুবিধায় আকৃষ্ট হয়ে সব রকম সঞ্চয় ও ঋণ নিয়ে মানুষ জমায়েত হয়েছিল শেয়ারবাজারে। তারপর শুরু হলো পতন। খুব দ্রুত দেশের লাখ লাখ মানুষের সম্পদ স্থানান্তরিত হয়ে গেল কিছু ব্যক্তির হাতে। সরকার বলতে থাকল, আমাদের কিছু করার নেই। তদন্ত কমিটি কিছু কারণ বের করল, কিছু গোষ্ঠীকে চিহ্নিতও করল; কিন্তু সরকার তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেবে না বলে পণ করেছে। সেই টাকা কোথায় গেল, তারও কোনো হদিস নেই। এ রকম ধারণা করার যুক্তিসংগত কারণ আছে যে সেই বিপুল পরিমাণ টাকা ডলারে পরিণত করে বাইরে পাচার করা বর্তমান ডলারসংকটের অন্যতম কারণ।
মূল কারণ দূর করায় সরকারের অনীহার কারণে দেশের শেয়ারবাজারের আছড়ে পড়া অবস্থারও তাই কোনো পরিবর্তন নেই। ইতিমধ্যে দুজনের আত্মহত্যার খবর সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়েছে। লাখ লাখ পরিবার অভূতপূর্ব সংকটের মুখে। সম্পদের বদলে তাদের ঘাড়ে এখন ঋণ। স্বাচ্ছন্দ্যের বদলে তাদের এখন হাহাকার। এমএলএম নামের দ্রুত টাকা বানানোর নানা প্রক্রিয়ায়ও অনেক মানুষ যুক্ত হয়েছে। প্রায়ই তাঁদের হাহাকার পত্রিকায় আসে, শহীদ মিনারে তাঁরা অনশন করেন। সরকার নির্লিপ্ত, মাঝেমধ্যে মুখের দু-একটা কথা। কারণ বোধগম্য, এসবের সঙ্গে নানা প্রভাবশালী লোক জড়িত।
টাকার মূল্যমানের অবনতি গত কয়েক মাসে অনেক দ্রুত ঘটেছে। টাকার তুলনায় ডলারের দাম ক্রমাগত বেড়ে যাওয়ায় টাকার অঙ্কে রপ্তানিকারক পোশাক কারখানার মালিক ও প্রবাসীদের আয় বেড়েছে। কিন্তু শ্রমিকদের আপেক্ষিক আয় কমেছে। অন্যদিকে আমদানি করা দ্রব্যাদির দাম বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন ব্যয় থেকে শুরু করে গৃহস্থালির ব্যয়—সবকিছুই বেড়েছে, সামগ্রিক জীবনযাত্রার ব্যয়ের ওপর চাপ বেড়েছে।
দেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের প্রধান উৎস দুটি: এক. প্রবাসীদের প্রেরিত অর্থ এবং দুই. তৈরি পোশাক রপ্তানি। এই দুই খাতে দিবারাত্র শ্রম দিচ্ছে প্রায় এক কোটি ২০ লাখ মানুষ। কোটি মানুষ হাড়ভাঙা খাটুনি খেটে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার মজুদ গড়ে তুলছে। আর যাদের ঘরে সম্পদের পাহাড়ের নিরাপত্তার জন্য এই মজুদের বড় অংশ বাইরে চলে যাচ্ছে, তাদের সংখ্যা হাজারও হবে না।
দেশে বৈদেশিক মুদ্রার মজুদ নিয়ে সরকারেরও উদ্বেগ প্রকাশিত হচ্ছে। তবে তা রূপান্তরিত হচ্ছে আইএমএফের কাছ থেকে এক বিলিয়ন ডলার ঋণ সংগ্রহে নানা তৎপরতায়। আইএমএফ বা বিশ্বব্যাংকের মতো প্রতিষ্ঠান যখন ঋণ দেয়, তার আওয়াজ বহুদিন থেকে চলতে থাকে। ১০০ টাকা ঋণ দিলে তা নিয়ে এতবার এত দিন ধরে কথা হতে থাকে, তা ১০ হাজার টাকার ভাব তৈরি করে। মনে হয় সেটাই একমাত্র উদ্ধারের পথ। আইএমএফের এক বিলিয়ন বা ১০০ কোটি ডলার ঋণ এখনো চূড়ান্ত হয়নি, কিন্তু তাদের হাসিমুখ প্রার্থনায় কয়েক দফা তেল-গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়েছে, সামনে আরও বাড়ানো হবে। আইএমএফ ঋণ দিতে বহুদিন ধরেই ধরনা দিচ্ছে। এসব ঋণ দেওয়ার সঙ্গে তাদের অনেক স্বার্থ জড়িত। সে জন্য এসব ঋণ নিয়ে কোনো দেশ তার সংকট থেকে মুক্ত হয়নি, বরং আরও ঋণগ্রস্ততার দুষ্টচক্রে পতিত হয়েছে। আফ্রিকা, পূর্ব এশিয়া ও লাতিন আমেরিকার বহু দেশ তার সাক্ষী।
দেশের বৈদেশিক ঋণ যা ‘বিদেশি সাহায্য’ নামে পরিচিত, তার জন্য আমরা অনেকের হাহাকার শুনি। কিন্তু আমরা যদি বছরে গড়পড়তা নিট বৈদেশিক তহবিলপ্রবাহ বিবেচনা করি, তাহলে তার ১০ গুণ বেশি অর্থ প্রবাসীদের থেকেই আসে। এখন প্রবাসীদের পাঠানো অর্থের পরিমাণ বছরে প্রায় ১২ বিলিয়ন ডলার। তার মানে আইএমএফের কাছ থেকে বহু রকম শর্ত ও আওয়াজ দিয়ে যে পরিমাণ ঋণ নেওয়া হচ্ছে, তা প্রবাসীরা প্রতি এক মাসে নীরবে দেশে পাঠাচ্ছেন। আইএমএফ এই ঋণ দেবে তিন বছরে, অনেক শর্ত বাস্তবায়ন করার পর। অর্থাৎ তার প্রতিবছরে ছাড় করা ডলার হবে প্রবাসীদের প্রতি ১০ দিনে পাঠানো অর্থের সমান। তার পরও অর্থমন্ত্রী এই ঋণ পাওয়ার জন্য অনড়। তা নিশ্চিত করার যেসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে তাতে অর্থনীতিতে উৎপাদন ব্যয়, পরিবহন ব্যয় ও জীবনযাত্রার ব্যয় সবই বাড়ছে, সামনে আরও বাড়বে। টানতে না পেরে ঋণগ্রস্ততার চাপ বাড়ছে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের।
অর্থমন্ত্রী এতেও ক্ষান্ত নন। তিনি সার্বভৌম ঋণ নেওয়ার তোড়জোড় করছেন। এটা হচ্ছে সার্বভৌমত্ব বন্ধক দিয়ে ঋণ। তাঁর দাবি, এতে দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হবে! ঋণগ্রহণের ব্যাপারে সরকারের অতিআগ্রহ বহুদিক থেকেই বিপদ ডেকে আনছে। ভারতকে ট্রানজিট-সুবিধা দেওয়ার ব্যবস্থা করার জন্য ভারতের কাছ থেকেই ঋণ নেওয়া হয়েছে। যে ঋণ অনুযায়ী ইট-বালু, সিমেন্টও তাদের কাছ থেকেই আনতে হবে। সুদও দিতে হবে, জরিমানাও। উল্লেখ্য, ভারতের জন্য সুবিধা দিতে সরকারের উদারতা সীমাহীন, ট্রানজিট নিয়ে যথাযথ চুক্তি না হলেও তাদের ভারী মালামাল পরিবহনের জন্য তিতাস নদীর প্রবাহ বন্ধ করে রাস্তাও তৈরি করা হয়েছে।
দেশের ব্যাংক থেকেও সরকার ঋণগ্রহণে আগের সব রেকর্ড ভঙ্গ করেছে। এর কারণ হিসেবে বাড়তি তেল এনে বিদ্যুৎসংকট সমাধানের কথা বলা হয়। বরাবরই বাংলাদেশের আমদানির একটা বড় অংশ তেল। এখন তা প্রায় দ্বিগুণ বেড়েছে। বাংলাদেশের মতো দেশের জন্য তেল আমদানিনির্ভরতা বিপজ্জনক। কেননা আন্তর্জাতিকভাবে তেলের দাম সব সময়ই অস্থিতিশীল, ভবিষ্যতে আরও হবে। তেল নিয়ে সংঘাত, যুদ্ধ এবং সর্বোপরি ফাটকাবাজারির কারণে এই সংকট আরও বাড়বে। সেই পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশের মতো দেশকে তার নিজের জ্বালানি সম্পদ শতভাগ দেশে রাখতে হবে, কোনো রকম রপ্তানিমুখী চুক্তি যাতে না হয়, এমন ধরনের চুক্তি যাতে না হয়, যাতে ২৫ টাকার গ্যাস ৩০০ টাকায় কিনে বিদ্যুৎ বা গ্যাসের দাম বাড়ে এবং শেষ পর্যন্ত উৎপাদনশীল খাত ক্ষতিগ্রস্ত হয়, সে সব নিশ্চিত করতে হবে। গ্যাস, কয়লা দেশের মধ্যে শতভাগ ব্যবহারের নিশ্চয়তা এবং জাতির সক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যমে কম দামে জ্বালানি-শক্তি প্রাপ্তি নিশ্চিত করা বাংলাদেশের পক্ষে সম্ভব। কিন্তু এ দেশের কোনো সরকারেরই সেদিকে মন নেই।
সংকট সমাধান করতে গিয়ে নতুন নতুন সংকটের বোঝা তৈরির নীতির একটি দৃষ্টান্ত রেন্টাল বা কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্র। জরুরি ভিত্তিতে বিদ্যুৎসংকটের সমাধানের নামে এই ব্যবস্থা করা হয়েছে। বিদ্যুৎসংকটের সমাধান অস্থায়ী বা খণ্ড খণ্ডভাবে হয় না। তার সঙ্গে সম্পর্কিত অন্য অনেক ধরনের বিষয় আছে। স্বল্প মেয়াদে বিদ্যুৎসংকট সমাধানের জন্য অনেক সহজ বিকল্প ছিল। তাতে আমদানিনির্ভরতা বাড়ত না, ঋণগ্রস্ততা এই মাত্রায় যেত না, তেল-বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর চাপ তৈরি হতো না, আবার দেশের সক্ষমতাও বাড়ত। কিন্তু সরকার তার পরিবর্তে কতিপয় গোষ্ঠীর স্বার্থ দেখতে গিয়ে দেশের ওপর দীর্ঘমেয়াদি ঋণ ও সংকটের বোঝা চাপিয়েছে।
ভুলনীতি ও দুর্নীতির কারণে দেশ যেভাবে ক্রমেই ঋণনির্ভর হচ্ছে এবং সেই ঋণের টাকায় রাষ্ট্রীয় প্রশাসনের যে রকম শানশওকত চলছে, তাতে গণি মিয়ার কথা মনে পড়ে। তাঁর গল্প ছোটবেলায় আমরা অনেকেই পড়েছি। ‘গণি মিয়া’ ছিলেন একজন কৃষক। কৃষক হিসেবে তিনি মোটামুটি ভালোই চলছিলেন। কিন্তু ভোগবিলাসের প্রতি তাঁর বিশেষ আসক্তি ছিল। কৃষির আয় থেকে তা সম্ভব ছিল না। গল্পে আছে, তাঁর আসক্তি এতই প্রবল ছিল যে, তিনি ঋণ করে হলেও ঘি খেতেন। ঋণের টাকা খুব সহজ, ব্যয়ের সময় গায়ে লাগে না। কিন্তু ঋণ বাড়তে থাকে, পাল্লা দিয়ে সুদও। যখন সেই ঋণ শোধ করার সময় হলো তখনই দেখা দিল বিপত্তি। সুদসহ ঋণের টাকা শোধ করতে করতে ফতুর হলেন তিনি। ঋণ করে ঘি খেয়ে শেষে পথে বসলেন কৃষক গণি মিয়া। এই ‘গণি মিয়ার’ সঙ্গে ‘মুহিত সাহেবের’ তফাত কী? তফাত আছে।
গণি মিয়া ঋণ করে নিজে ভোগ করেছেন, নিজেই তার মাশুল দিয়েছেন। কিন্তু মুহিত সাহেবরা যে ঋণের বোঝা তৈরি করছেন, তাতে তাঁর বা তাঁদের কোনো ঝুঁকি বা বিপদ নেই, মাশুলও তাঁদের দিতে হবে না। কতিপয় গোষ্ঠী বা সরকারের কতিপয় লোকজন সুবিধা ভোগ করবে ঠিকই। কিন্তু এই ঋণ ও তার ব্যয় সম্পর্কে জানার বা এ সম্পর্কে সিদ্ধান্ত দেওয়ার কোনো এখতিয়ার যাদের নেই, মাশুল দিতে হচ্ছে ও হবে সেই জনগণকে।
আনু মুহাম্মদ: অর্থনীতিবিদ ও অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।

বৃহস্পতিবার, ১২ জানুয়ারি, ২০১২

তেল-গ্যাস নিয়ে আত্মঘাতী চুক্তি

আনু মুহাম্মদ

তেল-গ্যাস নিয়ে আত্মঘাতী চুক্তি

জুন ১৫, ২০১১
ছবি. শিল্পী বড়ুয়া
ছবি. শিল্পী বড়ুয়া
জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব হলো বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা এবং শিল্প ও বিদ্যুৎসহ জনগণের স্বার্থে তার সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করা। জনগণ এই মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট সকল প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের বেতন ও সুযোগ-সুবিধা দিচ্ছেন তাদের স্বার্থ দেখার জন্য, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবার জন্য। কিন্তু গত প্রায় দুই দশকে সরকার পরিবর্তিত হলেও এই মন্ত্রণালয়ের দেশবিরোধী ভূমিকার কোন পরিবর্তন হয়নি। তারা একের পর এক যেসব চুক্তি এবং যেসব সিদ্ধান্ত নিয়েছে তাতে লাভবান হয়েছে কতিপয় বিদেশি বহুজাতিক কোম্পানি এবং দেশি কিছু গোষ্ঠী। কিন্তু দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ও জাতীয় নিরাপত্তা ক্রমেই আরও বেশি বেশি হুমকির মুখে পড়েছে। তাদের এই ভূমিকার সাম্প্রতিক উদাহরণ হচ্ছে গত মে মাসের প্রথমদিকে সান্টোস ও হেলিবার্টনের সঙ্গে তৃতীয় পক্ষের কাছে গ্যাস বিক্রির চুক্তি এবং কনকোফিলিপস-এর সাথে সাগরের গ্যাস ব্লক নিয়ে চুক্তির আয়োজন। সরকার দেশের গ্যাস সঙ্কটকে পুঁজি করে দেশের জন্য আত্মঘাতী সিদ্ধান্তের দিকে গেছে। তারা জাতীয় সংস্থাগুলোকে পর্যাপ্ত বাজেট দেয়নি। বিদেশি কোম্পানিগুলো নিজেদের দরকষাকষির শক্তি বাড়াতে অযথাই কালক্ষেপণ করেছে। আমরা বিভিন্ন সময়ে বিদ্যমান গ্যাস সংকট সমাধানের পথ দেখিয়েছি। বলেছি, দেশি প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা বাড়ান। পুরাতন এবং বন্ধ হয়ে যাওয়া কূপগুলো মেরামত করুন। বিবিয়ানা থেকে মজুতের তুলনায় বেশি গ্যাস উত্তোলন করতে দেয়া হচ্ছে শেভরনকে, বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠানকে দেয়া হচ্ছে না। নীতিগত জায়গা ঠিক থাকলে, প্রযুক্তি ও যন্ত্রপাতি নবায়ন করলে এই সমস্যা মোকাবিলা করে অনেক আগেই গ্যাস সংকট সমাধান করা যেতো।
কিন্তু সরকার সেই পথে যায়নি। সরকার সমস্যাকে জিইয়ে রেখেছে এবং এখন জাতিকে আরো বড় সমস্যার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। টিকিয়ে রাখা এই গ্যাস সঙ্কটের অজুহাত দিয়ে ‌‌‘তৃতীয় পক্ষের কাছে গ্যাস বিক্রির চুক্তি’র কারণে অস্ট্রেলীয় কোম্পানি সান্টোস ও মার্কিন কোম্পানি হেলিবার্টন এখন যেকোনো দামে তৃতীয় পক্ষের কাছে গ্যাস বিক্রি করতে পারবে। বাংলাদেশ যেখানে ২৫ টাকায় প্রতি হাজার ঘনফুট গ্যাস যোগান দিতে পারে, সেখানে উৎপাদন বণ্টন চুক্তির কারণে বিদেশি কোম্পানির কাছ থেকে এমনিতেই গড়ে ২৫০-৩০০ টাকা দিয়ে কিনতে হয়। এই তৃতীয় পক্ষের কাছে গ্যাস বিক্রির চুক্তির বলে এই সীমাও আর থাকবে না। বহুজাতিক কোম্পানিগুলো ৭ থেকে ৯ ডলার বা ৫০০-৭০০ টাকাতেও গ্যাস বিক্রির সুযোগ পাবে। অর্থাৎ উৎপাদন বণ্টন চুক্তির (পিএসসি) কারণে বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠানের তুলনায় যেখানে প্রথমে ১০ থেকে ৩০ গুণ বেশি দামে এতদিন বিদেশি কোম্পানির কাছ থেকে আমাদের নিজেদের গ্যাস কিনতে হ’ত সেখানে উপরোক্ত চুক্তির কারণে এখন কিনতে হবে ৫০-১০০ গুণ বেশি দামে। যে দাম দিয়ে আমাদের নিজেদের গ্যাস আমাদেরই কিনতে হবে তা মায়ানমার বা কাতার থেকে গ্যাস আমদানির মতোই ব্যয়বহুল হবে। দেশের বিদ্যুৎ প্লান্ট বা সার কারখানা হয় গ্যাসের অভাবে অচল থাকবে নয়তো এরকম ভয়াবহ দামে গ্যাস কিনতে গিয়ে গ্যাস বিদ্যুৎসহ সব কিছুর দাম বাড়বে। গ্যাস ও বিদ্যুতের অব্যাহত দামবৃদ্ধি এবং তার ফলে জনগণের জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির পেছনে এসব চুক্তি অন্যতম কারণ। সামনে তার চাপ আরও বাড়বে।
গ্যাস খাতে এখনই বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কারণে ভর্তুকি দেয়া হয় দুই হাজার কোটি টাকারও বেশি। এখনকার চুক্তিগুলো এই পরিমাণ আরও বাড়াবে। নিজেরা করলে এর এক-দশমাংশ দিয়ে একই পরিমাণ গ্যাস পাওয়া সম্ভব ছিল। ঝুঁকি হিসাব করেই এটা সম্ভব ছিল। তাতে গ্যাস, বিদ্যুৎ সহজপ্রাপ্য ও সুলভ দুটোই হতো। বাপেক্সকে তার অর্জিত টাকা নিজের উন্নয়নে খরচের অনুমতি দেয়া হলে সে অত্যন্ত দক্ষ ও সক্ষম একটি আন্তর্জাতিক মানের জাতীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে উঠতে পারতো। জাতীয় সংস্থার মাধ্যমে যদি ‘সুনেত্র’ (সুনামগঞ্জ-নেত্রকোনা) গ্যাস কূপ উন্নয়ন করা হয় তাহলে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের আশু কোন সম্ভাবনা থাকবে না। বাংলাদেশের মালিকানায় গ্যাস উত্তোলনের জন্য যে গবেষক ও যন্ত্রপাতি দরকার তা জাতীয় সংস্থাকে দেওয়া হলে বর্তমান জ্বালানি বাজেটের অর্ধেক বরাদ্দে জ্বালানি খাতের টেকসই উন্নয়ন করা সম্ভব।
বিদেশি কোম্পানির দেশীয় মুখপাত্ররা সবসময়ই বলেন, ‘আমাদের দক্ষতার অভাব রয়েছে’। অথচ আমরা দেখেছি বহুজাতিক অক্সিডেন্টাল আর নাইকো মিলে মাগুরছড়া আর টেংরাটিলার প্রায় ৫০০ বিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস নষ্ট করেছে। আমরা শেভরন ও নাইকোর কাছে এই ধ্বংসযজ্ঞের জন্য যে পরিমাণ টাকা পাই তার বর্তমান বাজার দর অনুযায়ী ৩৫ হাজার কোটি টাকা। এই অর্থ আদায় করবার জন্যও কোন উদ্যোগ কোন সরকার নেয়নি। সরকারের কাছে এরাই হচ্ছে দক্ষ। আর সরকারের কাছে অদক্ষ হলো বাপেক্স; যারা কখনো এরকম কিছু ঘটায়নি। দক্ষতা আকাশ থেকে পড়ে না, তার জন্য প্রয়োজনীয় নীতি ও ব্যবস্থা নিতে হয়। সুযোগ দিতে হয়। ভিশন ও অঙ্গীকার থাকতে হয়।
আর্থিক রক্তক্ষরণ, ধ্বংসযজ্ঞ এবং অর্থনৈতিক বোঝার এসব চিত্র থাকা সত্ত্বেও ৮০ ভাগ রপ্তানিমুখী চুক্তির মাধ্যমে কনোকোফিলিপস-এর হাতে তুলে দেয়া হচ্ছে সমুদ্রের গ্যাস ব্লক। এই কোম্পানির আছে বহু দুর্ঘটনার রেকর্ড । সম্ভবত সেকারণেই দুর্ঘটনায় ক্ষতিপূরণের বিষয়টি কনোকোফিলিপসের সাথে চুক্তিতে যতটা সম্ভব অস্বচ্ছ করা হয়েছে। বলা হচ্ছে পুঁজির অভাব। কত বিনিয়োগ করবে তারা? পাঁচ বছরে ১১০ মিলিয়ন ডলার বা ৭৭০ কোটি টাকা। এই টাকা বাংলাদেশের অর্থনীতির আয়তনের তুলনায় তুচ্ছ। এক বছরে এমপি আমলাদের জন্য সরকারি গাড়ি কেনার বাজেটই এর চাইতে বেশি। অথচ খোড়া যুক্তি দিয়ে সমুদ্রের সম্পদ তুলে দেয়া হচ্ছে এই মার্কিনী কোম্পানির হাতে। শতকরা ৮০ ভাগের মালিকানা তাদের, এই গ্যাস তারা এলএনজির মাধ্যমে রফতানি করতে পারবে– এই অধিকারও চুক্তিতে দেয়া আছে। দুর্ঘটনার দায় থেকেও তাদের বাঁচানোর চেষ্টা করা হয়েছে।
বলা হচ্ছে, তারা আগে পেট্রোবাংলাকে অফার করবে, কিন্তু নিজেরা পাইপলাইন তৈরি করে ভূখণ্ডে আনার চাইতে বিদেশ থেকে আমদানি করাই বেশি যুক্তিযুক্ত দেখানো হবে তখন। বলা হচ্ছে কনকোফিলিপস মেজারমেন্ট পয়েন্ট পর্যন্ত গ্যাস পৌঁছে দেবে। কিন্তু চুক্তিতে মেজারমেন্ট পয়েন্ট কোথায় হবে এটা সুনির্দিষ্ট করা নাই। পরে দেখা যাবে মেজারমেন্ট পয়েন্ট সাগরের মাঝখানে। চুক্তিতে ফাঁক থাকলে তা তাদের পক্ষেই যাবে। কারণ মন্ত্রণালয়, পেট্রোবাংলার শীর্ষ কর্মকর্তা, ও কনসালট্যান্টরা বারবার প্রমাণ করছেন তারা কতিপয় গোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষা করতেই জান কোরবান করছেন। তারা আমাদের জন্য গুপ্তঘাতক।
আসলে বহুজাতিক কোম্পানির স্বার্থ এবং আমাদের জাতীয় প্রয়োজন কখনোই এক হতে পারে না। তাদের দরকার যত তাড়াতাড়ি ও যত বেশি সম্ভব গ্যাস উত্তোলন করে তা বিক্রি করে উচ্চ মুনাফা নিশ্চিত করা, সেজন্যেই তারা রফতানির বিধানসহ গ্যাস বা কয়লা নিয়ে চুক্তিতে আগ্রহী। আর আমাদের দরকার, প্রয়োজন অনুযায়ী গ্যাস তুলে যতদিন সম্ভব তার সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করা। সেজন্যই জাতীয় মালিকানা ও জাতীয় সক্ষমতার প্রশ্ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
যে কাজ বিদেশি প্রতিষ্ঠানের জনসংযোগ কর্মকর্তাদের করার কথা এখন তা করছে জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা এবং কতিপয় কনসালট্যান্ট। বিদেশি প্রতিষ্ঠানের স্বার্থ দেখার কারণে তাদের পক্ষে এটা বোঝা অসম্ভব হচ্ছে যে, বিদেশি কোম্পানির মালিকানায় সীমিত নবায়নযোগ্য জ্বালানিসম্পদ রপ্তানির সুযোগ থাকা মানেই দেশের বর্তমান ও ভবিষ্যতের জন্য চরম নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করা। বহুদেশ এই পথে আজ চরম সংকটে। অনেকে বলছেন, রপ্তানির বিধান না রাখলে বিদেশি কোম্পানি আসবে না। যা না রাখলে তারা আসবে না – তা তারা করবে না, এটা আমাদের বিশ্বাস করতে হবে? তাহলে খনিজ সম্পদ রফতানি নিষিদ্ধকরণ আইন প্রণয়ন করতে বাধা কোথায়?
সবমিলিয়ে কনোকোফিলিপস-এর সঙ্গে পিএসসি ২০০৮ এর অধীনে সমুদ্রের গ্যাস ব্লক নিয়ে যে চুক্তি করতে যাচ্ছে সরকার, তার কারণে ভয়াবহ একটি পর্বে প্রবেশ করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। চুক্তির দলিলেই বলা হচ্ছে বাংলাদেশ কোনভাবেই ২০ ভাগের বেশি পাবে না। সেটাও সমুদ্র বক্ষ থেকে ভূসীমায় আনতে গেলে বাংলাদেশকে ব্যয়বহুল অবকাঠামো নির্মাণ করতে হবে। তরলায়িত করে(এলএনজি) কনোকোফিলিপস এই গ্যাস রফতানি করতে পারবে। এর পরিণতি হল গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট সত্ত্বেও বাংলাদেশের শতভাগ গ্যাসই পাচার হবে বিদেশে। সমুদ্রের বিশাল সম্পদসহ অন্যান্য ব্লকগুলোও ক্রমে এ ধরনের চুক্তির অধীনে বিভিন্ন বিদেশি কোম্পানির হাতে চলে যাবে। সমুদ্রসীমা এখনও নির্ধারিত হয়নি। ভারত আমাদের সীমার একাংশ দাবি করে রেখেছে, বাকি অংশ যাচ্ছে মার্কিনীদের হাতে। মার্কিন কোম্পানির নিরাপত্তার অজুহাতে মার্কিনী নৌ-বাহিনীর কর্তৃত্ব স্থাপিত হবে বঙ্গোপসাগরে। জ্বালানি ও জাতীয় নিরাপত্তা দুটোই বিপর্যস্ত হবে।
১৫ জুন ২০১১
আনু মুহাম্মদ: শিক্ষক, অর্থনীতিবিদ, গবেষক এবং তেল-গ্যাস রক্ষা জাতীয় কমিটির সদস্যসচিব ।